বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ১২:৩৪ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
মিরপুরে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া মাহফিল বিমান বন্দর থানায় বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া মাহফিল ২৯ নং ওয়ার্ডে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া মাহফিল মোহাম্মদপুরে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া মাহফিল ৩২ নং ওয়ার্ডে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া মাহফিল ৩১ নং ওয়ার্ডে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া মাহফিল বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে কৃষক লীগের শ্রদ্ধা নিবেদন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধা মোহাম্মদপুরে বিল্লাল হোসেন’কে প্রাণ নাশের হুমকি, থানায় জিডি স্মৃতির পাতায় ১৫ আগস্ট, আজ জাতীয় শোক দিবশ, বিনম্র শ্রদ্ধা শহিদের প্রতি

বধ্যভূমি, একটি বটগাছ ও একজন রবিউল

রিপোর্টারের নাম:
  • আপডেট টাইম শনিবার, ২ জুলাই, ২০২২
  • ৩৮ দেখা হয়েছে

মোঃ ইব্রাহিম হোসেনঃ একসময় রিকশা চালিয়েছেন, বাদাম–বুটও বিক্রি করেছেন। পরে মাংসের ব্যবসা করে কিছুটা সচ্ছলতা পেয়েছেন। ছোটখাটো গড়নের ষাটোর্ধ্ব এই মানুষের এখন ‘আরাম’ করার কথা। কিন্তু তিনি সেটা না করে বিভিন্ন জায়গা চষে বেড়াচ্ছেন, মানুষের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু কী তাঁর চাওয়া? ব্যক্তিগতভাবে বা পরিবারের কারও জন্য তিনি কিছু চান না। তাঁর চাওয়া শুধু একটি গাছ দখলমুক্ত ও সংরক্ষণ করা। গাছটি একটি বটগাছ।

বটগাছটি রক্ষা করতে চাওয়া ব্যক্তিটির নাম রবিউল আলম। গাছটির অবস্থান ঢাকার রায়েরবাজারে। রায়েরবাজার এলাকাটি আমাদের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বহু মানুষকে হত্যা করে।

রায়েরবাজারের যে অংশে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়, সেখানে সেই সময় ছিল তিনটি ইটখোলা, একাধিক ছোট-বড় খাল এবং জলাভূমি। রবিউলের বাসা সেখান থেকে খুব কাছেই। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ১১ বছরের একটু বেশি। ডিসেম্বরের ১১ তারিখে মাছ ধরতে গিয়ে তিনি প্রথম একটি ইটভাটায় অসংখ্য মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে ডিসেম্বরের ১৬, ১৭ ও ১৮ তারিখে তিনি নিজে ও তাঁর বন্ধুরা সেই মৃতদেহ উদ্ধারের কাজেও অংশ নেন।

রবিউলের দাবি, বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধটি এখন যেখানে অবস্থিত, এর বাইরেও (বেড়িবাঁধ বা রাস্তার ভেতরের অংশে) বধ্যভূমির অবস্থান ছিল। সেখানে একটি খালের পাশে ওই বটগাছের নিচে এনে আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা দফায় দফায় অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে। রবিউল বলেন, এই বটগাছ ইতিহাসের একটি অংশ। কিন্তু গাছটির আশপাশে বাড়িঘর তুলে কার্যত তা দখল করা হয়েছে।

গত ৩১ মে রায়েরবাজারের ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বটগাছটি একটি বাড়ির সীমানার ভেতরে। এখন বাড়িঘর, দোকানপাট হলেও একসময় যে সেখানে খালের শাখা-প্রশাখা ছিল, তার কিছু নমুনা রয়ে গেছে। রবিউল বলেন, অনেকেই খালের জায়গা দখল করেছেন। এর মধ্যে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের লোকজনও রয়েছে।

বটগাছ সম্পর্কে রবিউলের দাবি নিয়ে কথা হয় লেখক এবং মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাবিষয়ক গবেষক মফিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে বটগাছ থাকার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। এ কারণে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সময় সেখানে প্রতীকী একটি বটগাছ রোপণ করা হয়। যদি প্রকৃত বটগাছটির সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে সেটা দখলমুক্ত ও সংরক্ষণ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

৫০ বছরের অপেক্ষা এবং একটি বই

রবিউলের দাবি, মুক্তযুদ্ধকালীন তিনি একবার রাজাকার, আরেকবার পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। বয়স কম থাকায় রাজাকাররা তাঁকে ছেড়ে দেয়। আরেকবার গুলির মুখ থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এরপর থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা এবং বধ্যভূমির ভয়াল স্মৃতি তাঁকে তাড়িত করতে থাকে।

রবিউল স্ত্রী, সন্তান নিয়ে থাকেন রায়েরবাজারে। তিনি লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি লিখিত আকারে মানুষকে জানানোর অভিপ্রায় ছিল বরাবরই। সত্তর দশকের শেষ দিকে তিনি রাত্রিকালীন স্কুলে ভর্তি হন; জীবনযুদ্ধের পাশাপাশি শুরু হয় তাঁর আরেক ‘যুদ্ধ’। কয়েক বছরের মধ্যে রাত্রিকালীন স্কুলে গিয়ে তিনি মোটামুটি পড়তে এবং লিখতে শেখেন। এরপর থেকে তিনি পত্রপত্রিকায় নানা বিষয়ে লেখালেখি করতে থাকেন।

অবশেষে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রবিউলের স্বপ্ন পূরণ হয়। প্রকাশিত হয় তাঁর বই আমার দেখা রায়েরবাজার বধ্যভূমি এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রক্তেভেজা একটি বটগাছ। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এবং বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় তিনি এই বই বের করেন। গত একুশের বইমেলায় তাঁকে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বইটি বিক্রি এবং কখনো কখনো ছাত্রছাত্রী ও আগ্রহীদের মধ্যে বিনা পয়সায় তা বিলি করতে দেখা গেছে।

বটগাছ উদ্ধারে একাই লড়ছেন রবিউল

বটগাছটি উদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে রবিউল অনেক বছর ধরেই নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে পূর্ত মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তিনি চিঠি দিয়েছেন। এর আগে একবার দখলদারদের পক্ষ থেকে বটগাছটি কাটার উদ্যাগ নেওয়া হলে পরিবেশবাদী সংগঠন এবং স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তিনি সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। এরপরও বটগাছটি উদ্ধার ও সংরক্ষণে সরকারের তরফ থেকে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি বলে জানালেন রবিউল।

এ বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে বছিলা–রায়েরবাজারসংলগ্ন লাউতলা খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে রবিউল কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আশা পূরণ হয়নি। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তা থেমে যায়।

রবিউল বলেন, তিনি আশা করেছিলেন সিটি করপোরেশন লাউতলা খাল এবং এর শাখা–প্রশাখাগুলো উদ্ধার করবে। এটা করলে অবৈধভাবে দখল করা খাল ও জমির পাশাপাশি বটগাছটিও উদ্ধার হতো। কিন্তু শুরু হতে না হতেই উদ্ধার অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়াটা দুঃখজনক।

সরকার বা প্রশাসন—কারও কাছ থেকে তেমন কোনো সাড়া না পেয়ে রবিউল এখন বটগাছটি উদ্ধার করতে একাই বিভিন্ন রকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি সম্প্রতি মোহাম্মদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করার কথা ভাবছেন।

রবিউল জানান, বটগাছ উদ্ধার তৎপরতায় স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। তারা নানাভাবে তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি এসব উপেক্ষা করেই তাঁর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিবিজড়িত এই বটগাছ দখলমুক্ত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে—যেকোনো মূল্যে নিজের জীবদ্দশায় এই দৃশ্য দেখে যেতে যান রবিউল।সূত্রে-প্রথম আলো।

শেয়ার করুন

এই ধরনের আরও খবর...

Dairy and pen distribution

themesba-lates1749691102